উত্তর দিনাজপুর জেলার রামগঞ্জ এলাকায় বুধবার সকালে এক ব্যতিক্রমী সামাজিক উদ্যোগের সাক্ষী থাকলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দেশের অন্যতম বৃহৎ জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’-এর আদর্শকে সামনে রেখে বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্ব, কর্মী-সমর্থক এবং মহিলা সদস্যরা পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও তুলে ধরা হয়। কর্মসূচিতে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে উঠে আসে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা, স্বাস্থ্যকর সমাজ নির্মাণের অঙ্গীকার এবং আগামী দিনে আরও বৃহত্তর পরিসরে এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা।
বুধবার সকাল থেকেই রামগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত লক্ষ্য করা যায়। বিজেপির ১ নম্বর মণ্ডলের মণ্ডল সহ-সভাপতি পরেশ বসাক, বিজেপি নেতা লোকনাথ বসাক, মহিলা নেতৃত্ব রমা দাসসহ বহু মহিলা ও যুব কর্মী এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁদের হাতে ছিল ঝাড়ু, কোদাল, বস্তা এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী। কর্মসূচির সূচনায় স্থানীয় নেতৃত্ব পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এরপর সকলে মিলে এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেন।
এদিনের কর্মসূচির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল রামগঞ্জ হাই স্কুল সংলগ্ন এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে স্কুলের সামনে জমে থাকা আবর্জনার স্তূপ স্থানীয় মানুষদের জন্য একটি বড় সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছিল। আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি সেখানে মশা-মাছির উপদ্রবও বৃদ্ধি পাচ্ছিল বলে অভিযোগ ছিল। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অভিভাবকদের প্রতিদিন এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। সেই পরিস্থিতিতে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা সম্মিলিতভাবে ওই এলাকার সমস্ত আবর্জনা পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গিয়ে ফেলেন।
শুধুমাত্র রামগঞ্জ হাই স্কুল নয়, রামগঞ্জ গার্লস স্কুলের আশপাশের এলাকাতেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়। স্কুল চত্বর এবং রাস্তার ধারে জমে থাকা প্লাস্টিক, কাগজ, পচনশীল বর্জ্য এবং অন্যান্য আবর্জনা সংগ্রহ করে সরিয়ে ফেলা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ প্রতিদিন বহু ছাত্রছাত্রী সেখানে যাতায়াত করে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শিক্ষার্থীদের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অভিযানের সময় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায় মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। মহিলা নেতৃত্ব রমা দাসের নেতৃত্বে বহু মহিলা কর্মী ঝাড়ু হাতে রাস্তা পরিষ্কার করেন। তাঁরা আবর্জনা সংগ্রহের কাজেও অংশগ্রহণ করেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, পরিচ্ছন্নতা কেবল প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সামাজিক কর্তব্য। বাড়ির পাশাপাশি নিজের এলাকার পরিবেশ পরিষ্কার রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রামগঞ্জ বাজার এলাকাও এদিনের অভিযানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাজারের বিভিন্ন অংশে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করা হয় এবং ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার আহ্বান জানানো হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজার এলাকায় অনেক সময় অসচেতনভাবে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রাখা হয়, যার ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দেখা দেয়। এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়ে নেতৃবৃন্দ জনসচেতনতার ওপর জোর দেন।
পরেশ বসাক এদিন বলেন যে পরিচ্ছন্নতা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। তিনি জানান, একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হলে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে শুধুমাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তাই সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন যে স্বচ্ছ ভারত অভিযান শুধুমাত্র একটি দিনের কর্মসূচি নয়। এটি এমন একটি সামাজিক আন্দোলন, যার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব। তিনি জানান, আগামী দিনেও এই ধরনের কর্মসূচি নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হবে এবং এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে সচেতনতা প্রচার চালানো হবে। পাশাপাশি জনসাধারণের সুবিধার্থে শৌচালয় নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
লোকনাথ বসাক তাঁর বক্তব্যে বলেন, পরিবেশ দূষণ বর্তমানে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলার প্রবণতা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি মনে করেন, পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অভিযানে অংশগ্রহণকারী যুব কর্মীরা জানান, সমাজের উন্নয়নে যুবসমাজের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বলেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ আগামী দিনের সমাজ তাঁদের হাতেই গড়ে উঠবে। তাই পরিবেশ রক্ষা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার মতো বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার হওয়ায় এলাকায় অনেকটাই স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি নিয়মিত এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তাহলে এলাকার পরিচ্ছন্নতা আরও উন্নত হবে। কিছু বাসিন্দা জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের স্বার্থে এই ধরনের সামাজিক কর্মসূচি আয়োজন করা উচিত।
ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাঁদের মতে, পরিচ্ছন্ন বাজার এলাকা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে এবং ব্যবসার পরিবেশকে উন্নত করে। তাঁরা বলেন, বাজারে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা থাকলেও অনেক সময় মানুষ তা ব্যবহার করেন না। ফলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রাখলে তা থেকে নানা ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবর্জনার স্তূপে মশা, মাছি এবং বিভিন্ন রোগবাহী পোকামাকড় জন্ম নেয়, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। তাই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
স্বচ্ছ ভারত অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে আসছে। রামগঞ্জের এই উদ্যোগও সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এদিনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী মহিলারা জানান, পরিবারে পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। তাই বাড়ি থেকে শুরু করে সমাজ পর্যন্ত সর্বত্র পরিচ্ছন্নতার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। তাঁরা মনে করেন, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে একটি আরও সচেতন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অভিযান চলাকালীন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যার কথাও শোনেন বিজেপি নেতৃবৃন্দ। স্থানীয়দের অভিযোগ ও পরামর্শ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর পরিসরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
দিনের শেষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এলাকায় এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। দীর্ঘদিনের আবর্জনার স্তূপ সরিয়ে নেওয়ায় পরিবেশ অনেকটাই পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। স্থানীয় মানুষজন এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও এমন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সামগ্রিকভাবে রামগঞ্জে অনুষ্ঠিত এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুধু আবর্জনা পরিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল পরিবেশ সচেতনতা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এলাকার বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা এই কর্মসূচিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেই আশা প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।
