#গুন্ডামি রোধে কড়া আইন
#রেয়াৎ নয় গুন্ডামির
#হতে পারে বড় শাস্তি
### ভাঙচুরে এবার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
# আজ থেকে রাজ্যে কার্যকর গুন্ডা দমন আইন: ঘটনা ঘটার আগেই আটক, ভাঙচুরে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষমতা পুলিশের
কলকাতা, নিজস্ব সংবাদদাতা: পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। সোমবার থেকে রাজ্যে কার্যকর হল বহুল আলোচিত **গুন্ডা দমন আইন**। বিধানসভায় গুন্ডা দমন সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হওয়ার পর এবার সেই আইন কার্যকর হওয়ায় প্রশাসনের হাতে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা এল বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য।
নতুন আইনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল, কোনও ব্যক্তি সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়তে পারেন বলে প্রশাসনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকলে, প্রকৃত ঘটনা ঘটার আগেই তাঁকে আটক করার ক্ষমতা রাজ্য সরকার পাবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর নয়, সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধেও প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারবে।
আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি রাজ্য সরকার পুলিশ সুপারের নীচে নয় এমন পদমর্যাদার কোনও আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে সন্তুষ্ট হয় যে কোনও ব্যক্তিকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখতে আটক করা জরুরি, তাহলে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আটক (Preventive Detention)-এর নির্দেশ দিতে পারবে। প্রশাসনের মতে, এর ফলে বড় ধরনের অপরাধ, সংঘবদ্ধ হামলা, দাঙ্গা বা জনশান্তি বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা আগেভাগেই রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।
### সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আইনে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এমন কোনও কাজ যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা বা অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে গণ্য করা হবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
* জনগণের মধ্যে আতঙ্ক বা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
* জনশৃঙ্খলা ও জনশান্তি বিঘ্নিত করা।
* কোনও ব্যক্তির বৈধ ব্যবসা, পেশা বা জীবিকা নির্বাহে বাধা সৃষ্টি করা।
* স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি থেকে বেআইনিভাবে উচ্ছেদ করা।
* সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন।
* সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ বা তার নেতৃত্ব দেওয়া।
সরকারের মতে, বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরন বদলেছে। শুধু খুন বা ডাকাতির মতো অপরাধ নয়, সংগঠিত ভাঙচুর, তোলাবাজি, জমি দখল, ব্যবসায়ীদের হুমকি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করাও বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই আইনের আওতা বিস্তৃত করা হয়েছে।
### কাদের ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে?
আইনে ‘গুন্ডা’ শব্দটিরও একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এমন ব্যক্তি যিনি নিজে অথবা কোনও দল, গ্যাং বা সিন্ডিকেটের সদস্য কিংবা নেতা হিসেবে নিয়মিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত থাকেন, অথবা সেই ধরনের কাজ করার চেষ্টা করেন, অন্যকে উস্কানি দেন, অর্থ জোগান বা অন্য কোনওভাবে সহযোগিতা করেন, তাঁকে এই আইনের আওতায় আনা যেতে পারে।
অর্থাৎ শুধুমাত্র সরাসরি অপরাধে অংশগ্রহণকারী নয়, অপরাধ সংঘটিত করার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, সংগঠক কিংবা সহায়তাকারীর বিরুদ্ধেও এই আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
### কতদিন পর্যন্ত আটক রাখা যাবে?
নতুন আইনে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক রাখার বিধান রয়েছে। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
আটকের নির্দেশ জারি হওয়ার পর রাজ্য সরকারকে তিন সপ্তাহের মধ্যে মামলাটি একটি উপদেষ্টা বোর্ডের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এই বোর্ডে বিচার বিভাগীয় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা থাকবেন।
বোর্ড আটকের তারিখ থেকে সর্বোচ্চ নয় সপ্তাহের মধ্যে সরকারের কাছে রিপোর্ট জমা দেবে। সেই রিপোর্টে স্পষ্টভাবে জানানো হবে, আটক ব্যক্তিকে আরও আটক রাখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে কি না।
যদি বোর্ড মনে করে যে আটকের যথেষ্ট কারণ রয়েছে, তাহলে সরকার সেই নির্দেশ বহাল রাখতে পারবে। অন্যদিকে, যদি বোর্ড জানায় যে আটকের যথেষ্ট কারণ নেই, তাহলে সরকারকে অবিলম্বে আটকাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে হবে।
### ভাঙচুরে এবার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
গুন্ডা দমন আইনের পাশাপাশি কার্যকর হয়েছে **দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার (সংশোধনী) আইন**। এই আইনের মাধ্যমে বিক্ষোভ, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের ঘটনায় সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতি হলে তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য নতুন বিধান আনা হয়েছে।
সরকারের দাবি, অতীতে বহুবার রাজনৈতিক সংঘর্ষ, অবরোধ বা দাঙ্গার সময় সরকারি বাস, ট্রেন, অফিস, দোকান, বাড়ি এবং অন্যান্য সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের উপর এসে পড়েছে। নতুন আইনে সেই পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যেতে পারে।
### ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ‘ক্লেমস কমিশন‘
আইনে একটি বিশেষ **ক্লেমস কমিশন** গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতিগ্রস্ত মালিকেরা এই কমিশনের কাছে আবেদন করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন।
এই কমিশনকে দেওয়ানি আদালতের সমতুল্য ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রমাণ গ্রহণ, নথি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারি করার ক্ষমতা থাকবে কমিশনের।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কমিশনের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে বলে প্রশাসনের আশা।
### শুধু অপরাধী নয়, উস্কানিদাতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা
নতুন সংশোধনী আইনে শুধু সরাসরি ভাঙচুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিই নন, অপরাধে উস্কানি দেওয়া, অর্থ জোগানো, সংগঠকের ভূমিকা পালন করা অথবা অভিযুক্তকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারের মতে, অনেক সময় অপরাধের নেপথ্যে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীরা সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকেন না। ফলে শুধু মাঠপর্যায়ের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে প্রকৃত অপরাধচক্র ধরা পড়ে না। নতুন আইনে সেই ফাঁক বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
### রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আইন কার্যকর হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। রাজ্যের মন্ত্রী **দিলীপ ঘোষ** দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দাদাগিরি, গুন্ডামি এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপে অতিষ্ঠ। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চান এবং নতুন আইন সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে তিনি সমাজবিরোধীদের উদ্দেশে কড়া হুঁশিয়ারিও দেন।
### কী প্রভাব পড়তে পারে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের উপর। যদি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সংঘবদ্ধ অপরাধ, তোলাবাজি, জমি দখল এবং ভাঙচুরের মতো ঘটনায় লাগাম টানা সম্ভব হতে পারে। তবে একই সঙ্গে প্রশাসনিক ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার এবং নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নজর থাকবে, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর প্রশাসন কীভাবে তা প্রয়োগ করে এবং রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
#দেখুন ভারত টিভি – আস্থার আওয়াজ
