সংক্ষিপ্ত হাইলাইটস:
– দলীয় সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ইটাহারের তৃণমূল বিধায়ক মোশারফ হোসেন।
– আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে মায়ের চিকিৎসাজনিত ও পারিবারিক ব্যস্ততার কথা জানিয়েছেন।
– বিধানসভার স্পিকারের স্বীকৃত বিরোধী গোষ্ঠী (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আসল তৃণমূল’)-র সাথে যোগাযোগের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার।
– উত্তর দিনাজপুরের ৫ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৪ জন আগেই দল ছেড়েছিলেন, মোশারফের বিচ্ছেদে জেলায় সম্পূর্ণ একঘরে কালীঘাট শিবির।
ভারত টিভি ডিজিটালঃ রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এমনিতেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে জোড়াফুল শিবির। সেই ক্ষতে এবার নতুন করে নুনের ছিটে পড়ল। বিধানসভার বাজেট অধিবেশন চলাকালীনই শাসক শিবিরে এক বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিত মিলল। তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু সেলের রাজ্য সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের হেভিওয়েট বিধায়ক মোশারফ হোসেন। একদিকে যখন বিধানসভার অন্দরে নতুন বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ঐতিহাসিক বাজেট অধিবেশন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে, ঠিক তখনই কলকাতার বাইরে নিজের বাসভবনে আচমকা সাংবাদিক বৈঠক ডেকে এই নাটকীয় ঘোষণা করেন তিনি।
মোশারফ হোসেনের এই আকস্মিক পদত্যাগে উত্তরবঙ্গ তথা সমগ্র রাজ্যের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর দল যখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই মোশারফের এই সিদ্ধান্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের জন্য অত্যন্ত বড় এক ধাক্কা। বিশেষ করে রাজ্যের অন্যতম বড় ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত সংখ্যালঘু সমাজকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় অন্তরায় হতে পারে।
মায়ের অসুস্থতার খতিয়ান না কি গভীর রাজনৈতিক চাল?
রবিবার নিজের বাড়িতে ডাকা সাংবাদিক বৈঠকে মোশারফ হোসেন তাঁর পদত্যাগের পেছনে মূলত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন:
> “আমার মা গত বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত গুরুতর শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। দিনকয়েক আগেই তিনি পবিত্র মক্কা নগরী থেকে হজ পালন করে বাড়ি ফিরেছেন। মায়ের এই বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতিতে তাঁর পাশে থাকা এবং চিকিৎসার তদারকি করা আমার একমাত্র প্রধান কর্তব্য। এই মানসিক উদ্বেগের মধ্যে দাঁড়িয়ে দলের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সেলের শীর্ষ পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সে কারণেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং রাজ্য নেতৃত্বকে আমার এই সিদ্ধান্তের কথা মৌখিক ও সাংগঠনিক স্তরে জানিয়ে দিয়েছি।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই তত্ত্ব পুরোপুরি গিলতে রাজি নন। গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া বিধানসভার অতি গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই অনুপস্থিত ছিলেন ইটাহারের এই তরুণ বিধায়ক। তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। রবিবারের এই সাংবাদিক বৈঠক সেই জল্পনাতেই যেন সিলমোহর দিল। দল ছাড়ার পেছনে পারিবারিক কারণ দর্শালেও, তাঁর পরবর্তী বয়ান ঘাসফুল শিবিরের উদ্বেগ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
“বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে”: প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি বিধায়কের
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোশারফ হোসেন অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নেন যে, বিধানসভার স্পিকারের স্বীকৃত বিরোধী গোষ্ঠী অর্থাৎ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রাজ্যে শাসন ক্ষমতা বদল হওয়ার পর আগের পরিকাঠামোয় কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। একজন বিধায়ক হিসেবে আমার প্রথম দায়বদ্ধতা এলাকার মানুষের কাছে। তাই ইটাহারের মানুষের স্বার্থে এবং সার্বিক উন্নয়নের তাগিদে আমি বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আগামী দিনে তাঁর সঙ্গেই চলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।”
এখানেই শেষ নয়, বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসাও শোনা যায় মোশারফের গলায়। পুরোনো স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী একসময় আমাদের দলের হয়ে উত্তর দিনাজপুর জেলার পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই সময় থেকেই ওঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত সুমধুর ও মজবুত। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন করতে হলে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন। আগামী দিনে ওঁর নেতৃত্বে রাজ্যে যে অভূতপূর্ব উন্নয়নের কাজ হবে, আমি তার শরিক হতে চাই।”
উত্তর দিনাজপুরে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ মমতা শিবির
রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকে বিচার করলে মোশারফ হোসেনের এই পদক্ষেপ উত্তর দিনাজপুরে তৃণমূল কংগ্রেসকে এক চরম শূন্যতার দিকে ঠেলে দিল। উল্লেখ্য, এই জেলায় তৃণমূলের মোট ৫ জন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক হাওয়া বদল হতেই ৪ জন বিধায়ক একযোগেক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরে নাম লিখিয়েছেন।
মোশারফ হোসেন ছিলেন পঞ্চম এবং শেষ স্তম্ভ। তিনিও এবার কালীঘাট থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে বিরোধী দলনেতার শিবিরের দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ায়, উত্তর দিনাজপুর জেলায় মূল তৃণমূল কংগ্রেস খাতায়-কলমে একেবারে অভিভাবকহীন এবং একঘরে হয়ে পড়ল। দলের অন্দরের খবর, একাধিক প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সংখ্যালঘু নেতাকে পিছনে ফেলে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই মোশারফকে সংখ্যালঘু সেলের রাজ্য সভাপতির মতো গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি তাঁকে সংখ্যালঘু বিত্ত নিগমের চেয়ারম্যান পদও দেওয়া হয়। এত দ্রুত রাজনৈতিক উত্থানের পরেও তাঁর এই দলবদল স্বাভাবিকভাবেই দলের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া চরম অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
তৃণমূল নেতৃত্বের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ও আগামী দিনের সংঘাত
মোশারফ হোসেনের এই পদত্যাগের পর তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়েছে। দলের শীর্ষ এক নেতার দাবি, “যাঁরা কঠিন সময়ে দলের পাশে না থেকে ক্ষমতার অলিন্দের দিকে ছোটেন, তাঁদের মানুষ ক্ষমা করবে না। মায়ের অসুস্থতার কথা বলাটা আসলে একটা অজুহাত মাত্র। আসল উদ্দেশ্য যে ক্ষমতার লোভ এবং দলবদল, তা ওঁর বক্তব্যেই পরিষ্কার।”
তৃণমূলের অন্দরের বর্তমান ফাটল যেভাবে প্রকাশ্যে আসছে, তাতে তৃণমূল শিবির আরও বেশি দুর্বল হয়ে উঠেছে। বিজেপি এবং ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি কেবল শুরু। আগামী দিনে বাজেট অধিবেশন যত এগোবে, কালীঘাটের শিবিরে এই ধরনের ভাঙনের হিড়িক আরও বাড়বে বলেই রাজনৈতিক মহলের দাবী।
আপাতত সোমবারের বাজেট অধিবেশনে মোশারফ হোসেন বিধানসভায় যোগ দেন কি না এবং সেখানে তাঁর বসার আসন কোন ব্লকে নির্ধারিত হয়, সেদিকেই গভীর নজর রাখছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। রাজ্য রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের এই বড়সড় ওলটপালট আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।
বিস্তারিত জানুন –
