উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জের বলাইগাঁও এলাকায় সাপের ছোবলে এক গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃতার নাম মাম্পি বর্মন (৩৬)। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসার যুগে সাপের কামড়ের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ওঝার শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার মৃতদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তদন্তও শুরু করেছে পুলিশ।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, রবিবার সন্ধ্যায় বাড়ির বাইরে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে গিয়েছিলেন মাম্পি বর্মন। সেই সময় আচমকাই তাঁর পায়ে কিছু একটা কামড়ানোর অনুভূতি হয়। প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তবে কিছুক্ষণ পর তিনি অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করলে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান।
পরিবারের দাবি, ওই সময় তাঁরা বুঝতে পারেন যে কোনও বিষধর প্রাণী কামড়াতে পারে। স্থানীয় গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের কারণে এলাকার এক ওঝাকে ডাকা হয়। ঘটনাস্থলে এসে ওই ওঝা গৃহবধূকে সাপে ছোবল দিয়েছে বলে জানান। এরপর পরিবারের সদস্যরা আর সময় নষ্ট না করে তাঁকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
স্থানীয় সূত্রে খবর, প্রথমে মাম্পি বর্মনকে মহারাজা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা তাঁকে দ্রুত রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে রায়গঞ্জ মেডিকেলে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাণ হারাতে হল এক গৃহবধূকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানিয়েছেন, মাম্পি বর্মন এলাকার পরিচিত মুখ ছিলেন। পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তা হল, সাপের কামড়ের মতো একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতিতে কেন প্রথমেই ওঝাকে ডাকা হয়েছিল? আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির পরেও গ্রামীণ এলাকার বহু মানুষ এখনও বিভিন্ন কুসংস্কার এবং প্রচলিত বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, ততই প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
তবে মৃতার পরিবারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। মৃতার ভাই জানিয়েছেন, ওঝাকে ডাকা হলেও চিকিৎসা শুরু করতে কোনও ধরনের বিলম্ব হয়নি। তাঁর দাবি, সাপে ছোবল দেওয়ার সন্দেহ হওয়ার পরপরই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরিবারের মতে, ওঝাকে ডাকা হয়েছিল মূলত কী কারণে শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিয়েছে তা বোঝার জন্য, চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়।
যদিও এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও স্থানীয় মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরিবর্তে প্রথমে ওঝার কাছে যাওয়ার প্রবণতা এখনও সমাজের একাংশে রয়ে গিয়েছে, যা অনেক সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সাপের কামড়ের মতো ঘটনায় প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসক মহলের একাংশের মতে, সাপের কামড়ের পর আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রেই বিষধর সাপের কামড়ে দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ এবং চিকিৎসা শুরু করা গেলে প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়। তাই কুসংস্কার বা লোকবিশ্বাসের উপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।
উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় প্রতিবছর বর্ষাকাল এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পায়। মাঠঘাট, ঝোপঝাড় এবং বাড়ির আশপাশে সাপের উপস্থিতি বাড়ার কারণে সাপের কামড়ের ঘটনাও তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই ধরনের ঘটনা প্রায়শই সামনে আসে। স্বাস্থ্য দফতর বিভিন্ন সময়ে সচেতনতা প্রচার চালালেও এখনও অনেক জায়গায় কুসংস্কারের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানিয়েছেন, বলাইগাঁও এবং সংলগ্ন এলাকার বহু মানুষ এখনও সাপের কামড় বা অন্যান্য আকস্মিক শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে প্রথমে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের সাহায্য নেন। যদিও নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন সরাসরি হাসপাতালে যাওয়ার পক্ষপাতী। এই ঘটনার পর আবারও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে বলে মনে করছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। আপাতত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এদিকে, মাম্পি বর্মনের মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত পরিবার। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তিনি সংসারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারের উপর নেমে এসেছে গভীর সংকট। প্রতিবেশীরাও পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে সাপের কামড়ের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসার গুরুত্ব কতটা। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখা, দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। অন্যদিকে কুসংস্কার এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর নির্ভরতা অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
রায়গঞ্জের বলাইগাঁওয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনা তাই শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতির গল্প নয়, বরং সমাজে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
