দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার উন্নয়নের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে চলেছেন বালুরঘাটের সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড. সুকান্ত মজুমদার। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পর এবার জেলার দীর্ঘদিনের দাবি বিমান পরিষেবা চালুর বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্তরে তুলে ধরে নতুন করে আশার সঞ্চার করলেন তিনি। সোমবার নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী রামমোহন নাইডুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন ড. সুকান্ত মজুমদার। সেই বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল বালুরঘাট বিমানবন্দরকে কার্যকর করা এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে নিয়মিত বিমান পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল জেলার সঙ্গে বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। স্বাধীনতার পর থেকে জেলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হলেও বিমান যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। বালুরঘাটে বিমানবন্দর থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সেটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে কলকাতা বা দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকেছেন জেলার সাধারণ মানুষ। ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রী, চাকরিজীবী, রোগী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বছরের পর বছর।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রীর সঙ্গে সুকান্ত মজুমদারের বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বৈঠকে তিনি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, জেলার ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের সম্ভাবনা এবং বিমান পরিষেবা চালুর প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলি বিশদে তুলে ধরেন। পাশাপাশি বালুরঘাট বিমানবন্দরকে আধুনিকীকরণ, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়মিত উড়ান পরিষেবা চালুর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সক্রিয় ভূমিকার দাবি জানান।
জানা গিয়েছে, বৈঠকে বালুরঘাট বিমানবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিমানবন্দরটি চালু করার জন্য কী ধরনের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন, কতটা বিনিয়োগ দরকার এবং কোন কোন বিমান সংস্থাকে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, সেই বিষয়েও প্রাথমিক স্তরে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন ড. সুকান্ত মজুমদার। জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রেল পরিষেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে তিনি একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এর আগে দক্ষিণ দিনাজপুরে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছিলেন। সেই উদ্যোগ জেলার মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল। এবার বিমান পরিষেবা চালুর প্রচেষ্টাকে জেলার উন্নয়নের আরেকটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও জেলার সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সড়ক ও রেল যোগাযোগের পাশাপাশি বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে সেই জেলার অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। দক্ষিণ দিনাজপুরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
বর্তমানে দক্ষিণ দিনাজপুর থেকে কলকাতায় পৌঁছতে সড়ক বা রেলপথের উপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সময়সাপেক্ষ এই যাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন, ব্যবসায়িক বৈঠক বা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজে দ্রুত যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিমান পরিষেবা একটি বড় সুবিধা এনে দিতে পারে। যদি বালুরঘাট থেকে নিয়মিত বিমান পরিষেবা চালু হয়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতা এবং দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হবে।
শুধু যাতায়াতের সুবিধাই নয়, বিমান পরিষেবা চালু হলে জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দক্ষিণ দিনাজপুর মূলত কৃষিনির্ভর জেলা। ধান, পাট, সবজি এবং বিভিন্ন কৃষিজ পণ্যের উৎপাদনে জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থার ফলে এই সমস্ত পণ্য বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। এর ফলে কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা সরাসরি উপকৃত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়াও নতুন শিল্প স্থাপন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বিমান পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কোনও এলাকায় বিনিয়োগের আগে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টি শিল্পপতি এবং বিনিয়োগকারীরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। সেই দিক থেকে বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে দক্ষিণ দিনাজপুরে নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ দিনাজপুরে একাধিক ঐতিহাসিক এবং দর্শনীয় স্থান রয়েছে। জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম। তবে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পর্যটন শিল্প এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছতে পারেনি। বিমান পরিষেবা চালু হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকরা সহজেই এই জেলায় পৌঁছতে পারবেন। এর ফলে পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে এবং স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বালুরঘাট বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে নানা আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিমান পরিষেবা চালুর সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও নানা প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বহু বছরের স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এবার কেন্দ্রীয় স্তরে বিষয়টি সরাসরি উত্থাপিত হওয়ায় নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন জেলার মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে দক্ষিণ দিনাজপুরের চেহারা অনেকটাই বদলে যাবে। জেলার তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জেলার মানুষ আরও বেশি সুবিধা পাবেন। একইসঙ্গে জেলার সার্বিক উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
বৈঠক শেষে ড. সুকান্ত মজুমদার জানান, বালুরঘাট থেকে বিমান পরিষেবা চালুর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দক্ষিণ দিনাজপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে সুখবর পাওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ দিনাজপুরকে উন্নয়নের মূলস্রোতে নিয়ে আসাই তাঁর লক্ষ্য। জেলার মানুষ যাতে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগ পান, সেই লক্ষ্যে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। বিমান পরিষেবা চালু হলে জেলার উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলার বিভিন্ন মহলও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠন, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং সাধারণ মানুষ সকলেই মনে করছেন, বালুরঘাট বিমানবন্দর চালু হওয়া শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়, বরং দক্ষিণ দিনাজপুরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
এখন সকলের নজর কেন্দ্রীয় সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বিমানবন্দর আধুনিকীকরণ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং উড়ান পরিষেবা চালুর প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হয়, সেটাই দেখার বিষয়। তবে দিল্লিতে হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক দক্ষিণ দিনাজপুরের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে। জেলার মানুষও আশাবাদী, বহু প্রতীক্ষিত বিমান পরিষেবার স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে।
