শিলিগুড়ি: বর্ষার শুরুতেই পাহাড়ি অঞ্চলে ধ্বসের আশঙ্কা আরও একবার বাস্তবে রূপ নিল। বৃহস্পতিবার ভোরে শিলিগুড়ি সংলগ্ন সেবক কালীমন্দিরের কাছে বাগপুল এলাকায় বড়সড় ধ্বস নামায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক বা এনএইচ-১০। এই সড়কটি উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চল তথা সিকিমের সঙ্গে সমতলের অন্যতম প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হওয়ায় হঠাৎ করে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাপক সমস্যার মুখে পড়েছেন পর্যটক, সাধারণ যাত্রী এবং পণ্য পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রাত থেকেই এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত চলছিল। ভোরের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে জাতীয় সড়কের উপর। মুহূর্তের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ রাস্তার উপর এসে জমা হয়। ফলে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। ধ্বসের খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রশাসন, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন।
এনএইচ-১০ উত্তরবঙ্গের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। এই পথ দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীবাহী গাড়ি, পর্যটকবাহী যান এবং পণ্যবাহী ট্রাক যাতায়াত করে। বিশেষ করে সিকিম, কালিম্পং এবং দার্জিলিংমুখী পর্যটকদের জন্য এই সড়ক অন্যতম ভরসার রাস্তা। ফলে হঠাৎ করে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু গাড়ি দীর্ঘক্ষণ আটকে পড়ে। রাস্তার দু’পাশে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যানবাহনের লাইন তৈরি হয়।
ঘটনার জেরে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন পর্যটকেরা। গ্রীষ্মকাল ও বর্ষার মরশুমে উত্তরবঙ্গ ও সিকিমে ভ্রমণের জন্য বহু পর্যটক আসেন। তাঁদের অনেকেই ভোরবেলা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু ধ্বসের কারণে মাঝপথে আটকে পড়তে হয়। অনেক পর্যটককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে রাস্তা পরিষ্কার হওয়ার আশায়।
অন্যদিকে পণ্যবাহী ট্রাকগুলিও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় পরিবহণ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী, খাদ্যপণ্য এবং ব্যবসায়িক মালপত্র নিয়ে চলা ট্রাকগুলি রাস্তার উপর আটকে পড়ে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ধ্বসের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের কর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। জেসিবি ও অন্যান্য মেশিন ব্যবহার করে রাস্তা থেকে পাথর ও মাটি সরানোর কাজ শুরু হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব রাস্তা পরিষ্কার করে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে আপাতত ওই এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ধ্বসের ফলে পাহাড়ের উপরের অংশ এখনও অস্থিতিশীল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এদিকে পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে প্রশাসনের তরফ থেকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের আবেদন জানানো হয়েছে। যাত্রী এবং পরিবহণ সংস্থাগুলিকে বিকল্প পথ ধরে চলাচল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ এবং ট্রাফিক বিভাগও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বর্ষাকালে সেবক এবং সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় প্রায়শই ধ্বসের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লাগাতার বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে গেলে ধ্বসের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। সেই কারণেই বর্ষার মরশুমে এই অঞ্চলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। তবে এবারের ধ্বস আবারও পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বল দিকটি সামনে এনে দিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে প্রতি বছর একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় আরও উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, শক্তিশালী রিটেইনিং ওয়াল এবং নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মত তাঁদের।
ঘটনার জেরে পর্যটন শিল্পেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। কারণ এনএইচ-১০ বন্ধ হয়ে গেলে সিকিম এবং কালিম্পংমুখী পর্যটকদের যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়। যদিও প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে যে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সবরকম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উদ্ধার ও পরিষ্কার করার কাজ জোরকদমে চলেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং নতুন করে ধ্বস না নামলে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তা আংশিকভাবে খুলে দেওয়া সম্ভব হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের তরফ থেকে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে চলার এবং সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলার আবেদন জানানো হয়েছে।
সেবকের বাগপুল এলাকায় এই ধ্বসের ঘটনায় উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে বড় ধাক্কা লাগলেও প্রশাসনের তৎপরতায় দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। এখন সকলের নজর রাস্তা পরিষ্কারের কাজ কত দ্রুত সম্পূর্ণ হয় এবং কবে আবার স্বাভাবিক হবে এনএইচ-১০-এর যান চলাচল, সেদিকেই।
