দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জ পুরসভায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন অস্থায়ী কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়মিতভাবে পুরসভার বিভিন্ন বিভাগে কাজ করলেও মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না তাঁরা।
বারবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিকের দফতরের সামনে বিক্ষোভে সামিল হন কর্মীরা।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী কর্মীদের দাবি, তাঁরা বহু বছর ধরে পুরসভার বিভিন্ন পরিষেবা ও প্রশাসনিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাঁদের প্রাপ্য বেতন সময়মতো মেলে না। অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক মাসের বেতন বকেয়া পড়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাঁদের।
কর্মীদের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় থেকেই বকেয়া বেতনের সমস্যা চলে আসছে। সেই সময় থেকে শুরু করে একাধিকবার আন্দোলন, স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার পরেও সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রতিবারই আশ্বাস মিলেছে, কিন্তু বাস্তবে বকেয়া অর্থ মেটানোর ক্ষেত্রে কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রায়গঞ্জ পুরসভা চত্বরে জড়ো হতে শুরু করেন অস্থায়ী কর্মীরা। পরে তাঁরা সংগঠিতভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবি জানান। বিক্ষোভের জেরে কিছু সময়ের জন্য পুরসভা চত্বরে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, তাঁরা কোনও অযৌক্তিক দাবি করছেন না। নিয়মিত কাজ করার পরও যদি ন্যায্য পারিশ্রমিক না মেলে, তাহলে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বাজারে বেতন না পেয়ে পরিবার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কর্মী দীপঙ্কর ব্যানার্জী বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে পুরসভার কাজে যুক্ত রয়েছি। নিয়মিত কাজ করছি, কিন্তু বেতন পাচ্ছি না। বহুবার কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানিয়েছি। শুধু আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলেনি। আমাদের পরিবার রয়েছে, সংসার রয়েছে। বেতন না পেলে কীভাবে চলবে? তাই বাধ্য হয়েই আন্দোলনের পথে নামতে হয়েছে।”
অন্য এক কর্মী টুম্পা সাহা দাস বলেন, “আমরা প্রত্যেকদিন নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করি। কিন্তু মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ার কারণে চরম আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অনেকেরই ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুক এবং বকেয়া বেতন মিটিয়ে দিক।”
আরও এক কর্মী শঙ্কর রায় বলেন, “বহু বছর ধরে এই সমস্যা চলছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানিয়ে এসেছি। কিন্তু কোনও ফল পাইনি। তাই এবার আন্দোলন ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না। আমাদের দাবি, দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের সমস্যা না হয়, তারও স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।”
বিক্ষোভকারীদের দাবি, তাঁরা শহরের পরিষেবা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরসভার নানা কাজে তাঁদের উপরই নির্ভর করতে হয়। অথচ তাঁদের প্রাপ্য বেতন সময়মতো না দেওয়ায় কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রায়গঞ্জ পুরসভায় কর্মরত একাধিক অস্থায়ী কর্মী দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বেতনের সমস্যায় ভুগছেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। ফলে ক্ষোভ ধীরে ধীরে জমতে জমতে এবার প্রকাশ্য আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।
বিক্ষোভ চলাকালীন কর্মীরা কার্যনির্বাহী আধিকারিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিভিন্ন স্লোগানও দেন। তাঁদের বক্তব্য, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন তাঁরা। প্রয়োজনে কর্মবিরতি বা আরও কঠোর কর্মসূচিও নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
অন্যদিকে, বিক্ষোভের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিষয়টি নিয়ে শহরবাসীর মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা কর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক সময়মতো পাওয়া উচিত। কারণ শহরের পরিষেবা ব্যবস্থা সচল রাখতে তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভায় অস্থায়ী কর্মীদের বেতন ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে সময়ে সময়ে আন্দোলনের ঘটনা সামনে এসেছে। রায়গঞ্জের ঘটনাও সেই বৃহত্তর সমস্যারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকেই। অস্থায়ী কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, তাঁদের দায়িত্ব নিয়মিত কর্মীদের মতো হলেও সুযোগ-সুবিধা এবং আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান। তবে শুধুমাত্র মৌখিক আশ্বাসে আর ভরসা করতে রাজি নন। বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
বর্তমানে কর্মীদের নজর পুর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বকেয়া বেতন মেটানোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার উপরই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ। তবে আপাতত বিক্ষোভের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ এবং দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন রায়গঞ্জ পুরসভার অস্থায়ী কর্মীরা।
শহরের প্রশাসনিক মহলেও এই আন্দোলন যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কারণ পুরসভার পরিষেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মীদের অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব নাগরিক পরিষেবার উপরও পড়তে পারে। তাই দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।
এখন দেখার, কর্মীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন সংক্রান্ত দাবির বিষয়ে পুর প্রশাসন কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ প্রশমনে কতটা সফল হয়। আপাতত বকেয়া বেতনের দাবিতে রায়গঞ্জ পুরসভা চত্বরে অস্থায়ী কর্মীদের বিক্ষোভ স্থানীয় প্রশাসনিক মহলে নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
