রক্তের সংকট মোকাবিলায় মানবিক উদ্যোগ হিসেবে শুক্রবার বালুরঘাট থানা মোড় এলাকায় স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের আয়োজন করল ভারতীয় জনতা যুব মোর্চা (বিজেওয়াইএম) বালুরঘাট শহর মণ্ডলী। সমাজসেবামূলক এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যুব মোর্চার কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিবিরে ১০০ ইউনিট রক্ত সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রক্তের চাহিদা পূরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিন অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে। উপস্থিত অতিথিরা সম্মিলিতভাবে প্রদীপ জ্বালিয়ে শিবিরের শুভ সূচনা করেন। উদ্বোধনী পর্বে রক্তদানের গুরুত্ব এবং মানবকল্যাণে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। আয়োজকদের বক্তব্য, রক্ত এমন একটি উপাদান যা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। মানুষের জীবন বাঁচাতে মানুষের রক্তের বিকল্প নেই। তাই সমাজের প্রত্যেক সুস্থ মানুষের উচিত নিয়মিত রক্তদান করা।
শিবিরে উপস্থিত ছিলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের স্বামীজি বিশ্বরূপানন্দ মহারাজ, বিজেপির দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সভাপতি স্বরূপ চৌধুরী, জেলা সাধারণ সম্পাদক বাপি সরকার-সহ দলের একাধিক নেতৃত্ব। উপস্থিত অতিথিরা রক্তদাতাদের উৎসাহিত করেন এবং সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অতিথিরা বলেন, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায়শই রক্তের সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, প্রসূতি মা, থ্যালাসেমিয়া রোগী এবং অন্যান্য গুরুতর অসুস্থ মানুষের জন্য নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়। সেই চাহিদা পূরণে স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিকল্প নেই। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তাহলে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
আয়োজকদের দাবি, যুব সমাজকে সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত করতেই এই ধরনের কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, সমাজের প্রয়োজনের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য। সেই ভাবনা থেকেই রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য শিবির, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
শিবিরে অংশগ্রহণকারী রক্তদাতাদের মধ্যে ছিলেন ছাত্র, যুবক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ। অনেকেই প্রথমবার রক্তদান করেন। প্রথমবার রক্তদান করতে আসা কয়েকজন যুবক জানান, মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে অংশ নিতে পেরে তাঁরা গর্বিত। ভবিষ্যতেও তাঁরা নিয়মিত রক্তদান করবেন বলে জানান।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রক্তদানের আগে প্রত্যেক রক্তদাতার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। রক্তচাপ, ওজন, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা-সহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলি যাচাই করে তবেই রক্ত সংগ্রহ করা হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে রক্তদাতাদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, পানীয় জল এবং খাদ্যের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানান, সমাজের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বর্তমানে বিভিন্ন সময় রক্তের প্রয়োজন হলেও প্রয়োজনমতো রক্ত পাওয়া যায় না। অনেক পরিবারকে রক্তের জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। এই ধরনের স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির সেই সমস্যা অনেকটাই কমাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তদান শুধু অন্যের জীবন বাঁচায় না, রক্তদাতার জন্যও উপকারী। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া যায় এবং শরীরে নতুন রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়াও সক্রিয় হয়। তবে রক্তদান অবশ্যই চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এবং নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে করা উচিত।
ভারতের মতো জনবহুল দেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হয়। যদিও বিভিন্ন সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি উদ্যোগে রক্ত সংগ্রহ করা হয়, তবুও অনেক সময় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম পড়ে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষাকালে রক্ত সংগ্রহের পরিমাণ কমে যায়। সেই সময় বিভিন্ন রক্তদান শিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যুব মোর্চার নেতৃত্ব জানান, তাঁদের লক্ষ্য শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক ইউনিট রক্ত সংগ্রহ নয়, বরং সমাজে রক্তদান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অনেকের মধ্যেই এখনও রক্তদান নিয়ে অযৌক্তিক ভয় এবং ভুল ধারণা রয়েছে। সেই ধারণা দূর করতে সচেতনতা গড়ে তোলাও এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এদিনের শিবিরে উপস্থিত বহু মানুষ রক্তদাতাদের উৎসাহ দেন। কেউ কেউ ভবিষ্যতে রক্তদানের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন। আয়োজকদের দাবি, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাঁদের উৎসাহিত করেছে। আগামী দিনেও আরও বৃহত্তর পরিসরে এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বলেন, মানবসেবার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সমাজসেবা সম্ভব। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। রক্তদান সেই মানবিক দায়িত্ব পালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজন রক্তদাতার দেওয়া সামান্য রক্ত একাধিক মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম। তাই সুস্থ মানুষদের নিয়মিত রক্তদানের আহ্বান জানান তাঁরা।
শিবির চলাকালীন এলাকায় শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে রক্তদাতাদের নিবন্ধন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রক্ত সংগ্রহের প্রতিটি ধাপ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা হয়। ফলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
দিনভর চলা এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় ইতিবাচক সাড়া পড়ে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাঁদের মতে, মানবকল্যাণমূলক এমন কর্মকাণ্ড যত বেশি হবে, ততই সমাজ উপকৃত হবে। বিশেষ করে যুব সমাজ যদি এ ধরনের কাজে আরও বেশি করে এগিয়ে আসে, তাহলে সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে রক্তের সংকট মোকাবিলা, স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহ বৃদ্ধি এবং মানবসেবার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই রক্তদান শিবির বালুরঘাটে এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আয়োজকদের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু প্রয়োজনীয় রক্ত সংগ্রহই নয়, আগামী দিনে আরও বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ হবেন। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অসহায় রোগীদের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেই জানিয়েছেন আয়োজকরা।
