উত্তরবঙ্গে ক্রমশই বাড়ছে গরমের তীব্রতা। গ্রীষ্মের শুরু থেকেই তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেলেও সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তা যেন নতুন মাত্রা ছুঁয়েছে। বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জসহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি পেরিয়ে যায়, যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কয়েক ডিগ্রি বেশি। এর জেরে কার্যত হাঁসফাঁস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জনজীবনে। সকাল থেকে তীব্র রোদের তাপে নাজেহাল হয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, আর দুপুর গড়াতেই পরিস্থিতি হয়ে উঠছে আরও অসহনীয়।
আবহাওয়া দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, উত্তরবঙ্গের বেশিরভাগ জেলাতেই আপাতত বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই। ফলে তাপমাত্রা আরও কিছুটা বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও আলিপুরদুয়ার জেলার কিছু অংশে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে, তবে তা সামগ্রিকভাবে উত্তরের গরম কমাতে খুব একটা সাহায্য করবে না বলেই মত আবহাওয়াবিদদের।
রায়গঞ্জ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সকাল থেকেই গরমের দাপট চোখে পড়ছে। সকাল ৯টার মধ্যেই রোদের তেজ এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যে বাইরে বের হওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। দুপুরের দিকে রাস্তা কার্যত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বেরোতে চাইছেন না। যারা কাজের সূত্রে বাইরে বেরোতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের অনেকেই মাথায় ছাতা, গামছা বা টুপি ব্যবহার করছেন রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে।
এই প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক এবং অন্যান্য খেটে খাওয়া মানুষ। রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাপজনিত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ডিহাইড্রেশন ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গিয়েছে।
শুধু প্রাপ্তবয়স্করাই নয়, এই গরমে সমস্যায় পড়ছে শিশুরা এবং প্রবীণরাও। স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেও গরমের প্রভাব স্পষ্ট। অনেক স্কুলে দুপুরের ক্লাস চলাকালীন পড়ুয়াদের অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ সময়সূচি পরিবর্তনের কথাও ভাবছে।
এদিকে, চিকিৎসকরা এই পরিস্থিতিতে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, তীব্র গরমে শরীরের জলশূন্যতা দ্রুত দেখা দিতে পারে, যা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ডাবের জল, লেবুর শরবত এবং বিভিন্ন মরশুমি ফল যেমন তরমুজ, বাঙ্গি ইত্যাদি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, রোদে বেরোলে অবশ্যই মাথা ও মুখ ঢেকে রাখা উচিত। ছাতা ব্যবহার করা, হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং যতটা সম্ভব দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলাই এই সময়ের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। এছাড়া অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনোর পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া দফতরের এক আধিকারিক জানান, “বর্তমানে উত্তরবঙ্গের ওপর কোনও উল্লেখযোগ্য নিম্নচাপ বা বৃষ্টিবাহী সিস্টেম সক্রিয় নেই। ফলে আগামী কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত গরমের এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে।” তিনি আরও জানান, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও তুলনামূলক বেশি থাকায় গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের কথায়, “এবারের গরম যেন আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকেই এমন গরম পড়ছে যে বাইরে বেরোনো দায় হয়ে যাচ্ছে।” অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দুপুরের সময় ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক দোকানদার ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
সব মিলিয়ে, উত্তরবঙ্গজুড়ে তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক। আপাতত বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা না থাকায় স্বস্তির কোনও খবর নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে সচেতনতা এবং সতর্কতাই একমাত্র ভরসা। পর্যাপ্ত জলপান, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং রোদের থেকে সুরক্ষা—এই তিনটি বিষয় মেনে চললেই অনেকটাই এড়ানো সম্ভব গরমজনিত সমস্যাগুলি।
পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়।
তবে আবহাওয়া দফতরের আপডেটের দিকে নজর রাখার পাশাপাশি নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
